মো: নুরু বেপারী
শহীদ ২০ জুলাই ২০২৪ · বয়স ৫৩ · Driver
Killed
- Killed
- ২০ জুলাই ২০২৪ (2024-07-20)
- Age
- ৫৩ (53)
- Occupation
- Driver
- Where
- Jatrabari
- How
- DEATH
- Father
- মৃত মজিদ বেপারী
- Mother
- উরফুরী বেগম
- Buried at
- মাতুয়াইল কবরস্থান, ঢাকা
জীবনী
"মরিয়ম, আর ক'দিন অপেক্ষা করো—আর আমাদের দুঃখ থাকবে না..."
শহীদ মো. নুরু বেপারীর স্মরণে
নদীবিধৌত বাগেরহাট জেলার মোড়েলগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম সরালিয়া গ্রামে ১৯৭১ সালের ৭ মে জন্ম নেন নুরু বেপারী। খুব ছোট বয়সেই হারান পিতাকে। সেই থেকে বড় ভাই ও অসহায় কিন্তু দৃঢ়চেতা মা-ই ছিলেন তার আশ্রয়। মায়ের ইচ্ছায়, সংসার টিকিয়ে রাখতে তিনি দ্বিতীয়বার বিবাহ করলেন না—নিজ হাতে গড়লেন সন্তানদের ভবিষ্যৎ। বড় হয়ে নুরু ড্রাইভিং পেশায় যুক্ত হয়ে রাজধানী ঢাকায় আসেন জীবিকার সন্ধানে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ভাড়ায় পিকআপ চালাতেন।
ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকার মেন্দিবাড়ীতে একমাত্র ছেলে ইলিয়াস ও স্ত্রী মরিয়মকে নিয়ে টানা নয় বছর ধরে বাস করছিলেন। তার মেয়ে বিবাহিত। ছেলে ইলিয়াস (৩০) অটোরিকশা চালিয়ে চলত। অল্প আয়ে, সীমাহীন অভাবের সংসারে যেটুকু হাসি ছিল, তা-ও হঠাৎ করে থেমে গেল এক জুলাই দুপুরে।
যেভাবে শহীদ হলেন
২০ জুলাই, ২০২৪—সেই বিভীষিকাময় দিনে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বুলেটে প্রাণ হারালেন নুরু বেপারী। পেশাগত কারণে রায়েরবাগ ব্রিজ সংলগ্ন রাস্তায় গাড়ি নিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। আন্দোলনের উত্তাপে চারদিক তখন রণক্ষেত্র। হঠাৎ করেই তার দেহে একে একে পাঁচটি গুলি বিদ্ধ হয়। চোখের সামনে সবকিছু ঘটে, নুরু’র বন্ধু তাহের আতঙ্কিত কণ্ঠে তার ছেলেকে ফোন করে বলেন, “তাড়াতাড়ি আয়, তোর বাপের শরীরে গুলি লেগেছে।”
১২টা ৩০ মিনিটে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন দুপুর ১টায়।
তার মরদেহ নিজ ছেলে বাড়ি নিয়ে আসে। ইচ্ছে ছিল, মা-বাবার কবরের পাশেই শোয়াবেন। কিন্তু আর্থিক দুরবস্থার কারণে তা আর সম্ভব হয়নি। প্রতিবেশীর সহায়তায় তাঁকে মাতুয়াইল কবরস্থানে দাফন করা হয়।
"আমাদের সংসার চলবে কীভাবে, মা?"
শহীদের স্ত্রী মরিয়ম বেগম (৪৪) এখন একেবারেই পরনির্ভরশীল। হার্টের রোগী, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে ভোগা এই নারীর দিন কাটে ওষুধের খোঁজে মানুষের দুয়ারে। নুরু তার স্ত্রীকে বলেছিলেন, "আর ক’দিন কষ্ট করো, সব ঠিক হয়ে যাবে।" কিন্তু সেদিন আসার আগেই ঘাতকের গুলি তার কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেয়।
ছেলে ইলিয়াস একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, “মা, আমাদের এখন কে দেখবে? সংসার চলবে কিভাবে?” মরিয়ম তখন কেবল ফ্যালফ্যাল করে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “আল্লাহ আছে…”
প্রতিবেশীরা কী বলেন?
হাজী মো. হজরত আলী বলেন, “নুরু বেপারী আমার বাড়িতে ৯ বছর ভাড়াটিয়া ছিলেন। এত ভদ্র আর সৎ লোক আমি খুব কম দেখেছি। ভাড়া দিতে দেরি হয়নি কখনও, নিজের পরিবারের মুখে খাবার না থাকলেও। তার মৃত্যুতে আমি যেন নিজের ভাইকে হারালাম।”
তিনি নিজ খরচে জানাজা ও দাফনের ব্যবস্থা করেন। বললেন, “এমন ভালো মানুষটিকে হারানো সত্যিই দুর্ভাগ্যের।”
আরেক প্রতিবেশী আবু ছাইম কষ্টে ভরা কণ্ঠে বলেন, “এই নিরীহ মানুষটিকে কেন গুলি করা হল? কেন তার পরিবারটিকে নিঃস্ব করে দেওয়া হল?”
এক শহীদের আত্মপ্রকাশ: কাল্পনিক আলাপন
_“আমার নাম নুরু বেপারী। আমিও ছিলাম আপনাদের মতো একজন সাধারণ মানুষ। কাজ করতে বের হয়েছিলাম—পরিবারের জন্য। পুলিশ থামতে বলল, আমি বললাম: কী অপরাধ আমার? যদি মৃত্যুই চাও, তাহলে গুলি করো। বুক খুলে দিলাম।
আমি মরেছি, কিন্তু আমার স্বপ্ন বেঁচে থাকবে। স্ত্রীকে বলেছিলাম, দেশের জন্য ঢাল হবো। এখন আমি নেই, কিন্তু আমি আছি—স্বাধীনতার ভোরের প্রতিটি আলোয়, নদীর মৃদু কলতানে, আর আমার দেশের প্রতিটি সংগ্রামে।”
Photographs (1)
Compiled from the public JRABD (July Revolution Archive Bangladesh) memorial register.