Md Ali
শহীদ ১৯ জুলাই ২০২৪ · বয়স ৩৮ · কর্মচারী
Killed
- Killed
- ১৯ জুলাই ২০২৪ (2024-07-19)
- Age
- ৩৮ (38)
- Occupation
- কর্মচারী
- Where
- New Market, Azimpur
- How
- DEATH
- Father
- ইদ্রিস চকিদার
- Mother
- মোসা: রং মালা
- Buried at
- আজিমপুর কবরস্থান
জীবনী
স্বৈরশাসনের সময়ে রাষ্ট্র যেন নিজ জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। ২০২৪ সালের আন্দোলন ছিল শুধু কোটা সংস্কারের দাবিতে নয়; এটি ছিল প্রজন্মের ন্যায্য বাঁচার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। ঢাকা, রংপুর, চট্টগ্রাম থেকে ছড়িয়ে পড়া সেই দাবির ঢেউ একসময় রাজধানীর রাস্তাকে রক্তাক্ত করে তোলে। স্লোগান, টিয়ার গ্যাস আর গুলির শব্দে ঢাকা শহর পরিণত হয়েছিল এক ভয়াল যুদ্ধক্ষেত্রে। আর ঠিক এই অস্থির সময়েই ইতিহাসের পাতায় যুক্ত হয় নীরব এক নাম—মো: আলী হোসেন।
১৯৮৬ সালের ১৫ অক্টোবর ঝাঁঝালো শরৎ দুপুরে জন্ম হয় তাঁর। সাত ভাইবোনের সবার ছোট, আলী ছিলেন ঘরের আনন্দ। বাবা ইদ্রিস চৌকিদার দরজার পাহারা দিতেন, মা মোছা: রংমালা রান্নার ধোঁয়ার আড়ালে সংসারের ভার সামলাতেন। গরিবি ছিল স্থায়ী সঙ্গী, কিন্তু সেই অভাবের মাঝেও আলীর হাসি ছিল সবার ভরসা। তাঁর শৈশব কেটেছে মাটির ঘ্রাণ আর পরিবারের ভালোবাসার মধ্যে, যদিও প্রতিটি দিন ছিল সংগ্রামের আরেকটি অধ্যায়।
আলী কখনো রাজনীতির মানুষ ছিলেন না। তাঁর জীবনের কেন্দ্র ছিল পরিবার আর শ্রম। কামরাঙ্গীরচরের আশরাফাবাদের এমারত মিয়ার বাড়ির একটি ছোট্ট ঘরে স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে চলছিল তাঁর সংসার। ছেলেরা তাঁকে “আব্বু” ডেকে জড়িয়ে ধরত, আর তিনি স্বপ্ন দেখাতেন—“একদিন তোমাদের জুতা কিনে দেব।” মাস শেষে মুষ্টিমেয় আয়ের টাকা দিয়েই সংসার চলত, কিন্তু তাঁর চোখে সবসময় ছিল পরিবারের সুখের ছবি।
১৯ জুলাই ২০২৪, ছিল এক রক্তাক্ত শুক্রবার। চারদিক ভরে ছিল টিয়ার গ্যাসের তীব্র গন্ধ, পুলিশের গুলির শব্দে কেঁপে উঠছিল শহর। কিন্তু আলী কোনো মিছিলে ছিলেন না, কোনো ব্যানারের নিচে তাঁর নাম ছিল না। তিনি শুধু যাচ্ছিলেন কাজে, সংসারের অন্ন জোগাতে। ঠিক তখনই গুলি এসে আঘাত হানে তাঁর ডান বুকে। অচেতন অবস্থায় তাঁকে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হয়, কিন্তু রাত সাড়ে দশটার দিকে তাঁর হৃদপিণ্ড থেমে যায়।
হাসপাতালে তিন দিন ধরে পড়ে থাকে তাঁর লাশ। পরিবারের আর্তনাদ, স্ত্রীর আহাজারি আর সন্তানদের নিঃশব্দ কাঁদনও রাষ্ট্রের কঠোর দেয়াল ভেদ করতে পারেনি। শেষমেশ আজিমপুর কবরস্থানে তাঁকে চুপচাপ দাফন করা হয়। কোনো রাষ্ট্রীয় শোক, কোনো পতাকা, কোনো ঘোষণা ছিল না—শুধু অল্প কিছু মানুষ আর অশ্রুসিক্ত নীরবতা।
আলীর ভাই বলেছিলেন, “আমরা যা দেখেছি, তা কোনো সিনেমা না, এটা রক্তমাখা বাস্তবতা।” প্রতিবেশীরা বলেছিলেন, তিনি ছিলেন নীরব কিন্তু সবার ভরসার মানুষ। স্ত্রী প্রতিদিন বালিশে মুখ লুকিয়ে বোঝেন, আর কেউ রাতে দরজা খুলে বলে না—“ঘুমাও, আমি এলাম।” তাঁর দুই সন্তানের জীবনের প্রথম শিক্ষা হয়তো এই—গরিবদের বাবারা রাষ্ট্রে মরলেও শহীদ বলে স্বীকৃতি পায় না।
আলী হোসেনের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারকেই ধ্বংস করেনি, এটি ভেঙে দিয়েছে আমাদের নীরবতার দেয়াল। তিনি ছিলেন না নেতা, ছিলেন না বক্তা; তিনি ছিলেন এই দেশের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের প্রতীক। তাঁর রক্ত আজ প্রমাণ করে দিয়েছে—রাষ্ট্রের গুলির সামনে গরিবরাও প্রশ্ন তোলে। ইতিহাস তাঁকে মনে রাখবে এক অনিচ্ছাকৃত শহীদ হিসেবে, যাঁর মৃত্যু আমাদের বিবেককে জাগিয়ে তোলে।
Photographs (1)
Compiled from the public JRABD (July Revolution Archive Bangladesh) memorial register.