Skip to the archive
July Diary
Search the archive
Portrait of MANSUR

MANSUR

শহীদ ২০ জুলাই ২০২৪ · বয়স ৪৪ · পাম্প মিস্ত্রী

Killed

Killed
২০ জুলাই ২০২৪ (2024-07-20)
Age
৪৪ (44)
Occupation
পাম্প মিস্ত্রী
How
DEATH
Father
মো: একলাল মিয়া
Mother
খায়রুন নেসা (মৃত)

জীবনী

ঢাকার মোহাম্মদপুরের বছিলা এলাকায় ১৯৮১ সালের ৩ নভেম্বর এক সাধারণ কিন্তু সাহসী সন্তানের জন্ম হয়—মো: মনসুর মিয়া। পিতা একলাল মিয়া ও মাতা খায়রুন নেসার সংসারে তিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা ও ন্যায়বোধসম্পন্ন এক মানুষ। শৈশব থেকেই মনসুর অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর ছিলেন। কোনো রাজনৈতিক দলের অনুসারী না হয়েও সমাজের বৈষম্য, দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরব হয়ে উঠতেন তিনি। নিজের জীবন ও সময়কে তিনি সবসময় মানুষের পাশে থাকার জন্যই উৎসর্গ করতেন।

মনসুর মিয়া ছিলেন সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। স্ত্রী ও একমাত্র পুত্র মামুন ইমাম রিমনকে নিয়ে ছিল তাঁর ছোট্ট কিন্তু সুখী সংসার। রিমন তখন মাদ্রাসায় আমপারা বিভাগে পড়াশোনা করছিল। বছিলায় পৈতৃক জমিতে একটি পুরনো ঘর থাকলেও তিনি আলাদা বাসায় পরিবার নিয়ে থাকতেন, যেন কর্মস্থলের কাছাকাছি থেকে সংসার ভালোভাবে চালাতে পারেন। একটি পাম্পে মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করে সামান্য আয়ে সংসার চালানো সহজ ছিল না, কিন্তু মনসুর কখনো হতাশ হননি। পরিবারের প্রতি ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধই তাঁকে প্রতিদিন প্রেরণা দিত।

২০২৪ সালের জুলাই মাসে যখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তুঙ্গে, তখন দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়েছিল ন্যায়বিচারের দাবিতে মানুষের কণ্ঠ। ছাত্ররা কোটা সংস্কারের দাবিতে প্রথমে আন্দোলন শুরু করলেও ক্রমে তাতে কৃষক, শ্রমিক, হকার, ব্যবসায়ীসহ সমাজের সব স্তরের মানুষ যোগ দেয়। মনসুরও ছিলেন সেই প্রতিবাদী জনতার একজন। তিনি জানতেন—এ লড়াই কেবল ছাত্রদের নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের অধিকারের লড়াই।

১৮ জুলাই বৃহস্পতিবার ছাত্রনেতারা ঘোষণা দেন “কমপ্লিট শাটডাউন”—অর্থাৎ সারাদেশে সম্পূর্ণ বন্ধ। এই কর্মসূচির পরদিন, ১৯ জুলাই সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে মোহাম্মদপুরের বছিলা ব্রিজের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে ঘটে এক ভয়াবহ ঘটনা। শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদরত জনতার ওপর র‌্যাব সদস্য ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ-যুবলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা একযোগে গুলি চালায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন—গুলিবর্ষণ ছিল অতর্কিত ও নির্বিচার। এলোপাথাড়ি গুলির শব্দে মুহূর্তেই চারপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

সেই গুলিতেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন মনসুর মিয়া। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে ভাই ও চাচাতো ভাই দ্রুত উদ্ধার করে রাত ৮টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। অবস্থা সংকটজনক হওয়ায় চিকিৎসকরা তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তর করেন। পরিবারের চোখে তখন একটাই আশা—মনসুর বেঁচে ফিরবেন। কিন্তু ভাগ্য যেন অন্য পরিকল্পনা করে রেখেছিল। পরের দিন, ২০ জুলাই শনিবার দুপুর ৩টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শহীদ হন মো: মনসুর মিয়া।

আনুমানিক রাত ৮টায় বছিলা গার্ডেন রোজ ময়দানে অনুষ্ঠিত হয় তাঁর জানাজা। হাজারো মানুষ সেখানে ভিড় জমায়—যারা একসময়ে তাঁর প্রতিবাদে পাশে থেকেছে, কিংবা অন্তত তাঁর সাহসী কণ্ঠের কথা শুনেছে। জানাজা শেষে রায়ের বাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয় তাঁকে।

মনসুর মিয়ার মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষকে কেড়ে নেয়নি—এটি সমাজ থেকে হারিয়ে দিয়েছে এক প্রতিবাদী, সাহসী ও ন্যায়নিষ্ঠ কণ্ঠস্বরকে। তাঁর স্ত্রী ও ছোট্ট ছেলের চোখে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা, কিন্তু মানুষ মনে রাখবে—তিনি নিজের স্বার্থের জন্য নয়, ন্যায় ও অধিকারের পক্ষে দাঁড়িয়ে জীবন দিয়েছেন। তাঁর রক্ত যেন প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়—“এই অন্যায়ের বিচার কবে হবে?”

Photographs (1)

Compiled from the public JRABD (July Revolution Archive Bangladesh) memorial register.