Skip to the archive
July Diary
Search the archive
Portrait of মোঃ নুরু বেপারী

মোঃ নুরু বেপারী

শহীদ ৭ জুলাই ২০২৪ · পিকআপ চালক (ভাঁড়ায় চালিত)

Killed

Killed
৭ জুলাই ২০২৪ (2024-07-07)
Occupation
পিকআপ চালক (ভাঁড়ায় চালিত)
Where
রায়েরবাগ, যাত্রাবাড়ী
Village
পশ্চিম সরালিয়া, উপ
District
মোড়েলগঞ্জ
Division
ঢাকা সিটি

জীবনী

“মরিয়ম, আর কয়দিন অপেক্ষা করো

আর আমাদের দুঃখ কষ্ট থাকবে না”

নদী মাতৃক জেলা বাগেরহাট জেলার মোড়েলগঞ্জ উপজেলার অন্তর্গত পশ্চিম সরালিয়া গ্রামে ০৭ মে ১৯৭১ সালে নুরু বেপারী জন্মগ্রহণ করেন। প্রাপ্ত বয়স্ক হয়ে উঠার আগেই তিনি চিরতরে তার বাবাকে হারান। তারপর থেকে অসহায় মা ও বড় ভাইয়ের কাছে তিনি লালিত-পালিত হয়েছেন। তার মা ছিলেন খুব চৌকশ একজন নারী। ছেলেদের বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত হবার আশংকায় সুযোগ থাকা সত্বেও তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেননি। বড় হয়ে নুরু বেপারী একজন ড্রাইভার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং রাজধানী শহর ঢাকায় এসে কাজ শুরু করেন। শাহাদত বরণ করার পূর্বে ভাড়ায় চালিত পিকআপ চালাতেন তিনি। তার একটি ছেলে ও একটি মেয়ে রয়েছে। মেয়ে বিবাহিতা। একমাত্র ছেলে ইলিয়াস (৩০) এবং স্ত্রীকে নিয়ে মেন্দিবাড়ী, বাবুর বাগ, যাত্রাবাড়ী এলাকায় দীর্ঘ নয় বছর ধরে বসবাস করে আসছিলেন তিনি। নুরুর একমাত্র ছেলে ইলিয়াস ভাড়ায় চালিত অটো রিক্সা চালক।

আন্দোলনের দিনগুলো

২০২৪ সালের জুলাই মাস ছিল দেশের জন্য অত্যন্ত বেদনার মাস। বিশেষ করে রাজধানীবাসীর জন্য এই মাসের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল আতংকের। রাস্তার ফুটপাত থেকে শুরু করে বাসার ছাঁদ, বেলকনি এমনকি বেডরুমেও মানুষ নিরাপদে ছিল না। যেদিকেই মানুষ সেদিকেই স্বৈরাচারী হাসিনার হায়েনার দল গুলি ছুড়ে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করেছে।

-তাড়াতাড়ি আয়, তোর বাপের শরীরে গুলি লেগেছে’

যেভাবে তিনি শহীদ হন

২০ জুলাই ২০২৪, স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার পালিত পুলিশ বাহিনী কর্তৃক এক বর্বরতার বলি হন মো: নুরু বেপারী। পেশায় পিকআপ চালক ছিলেন তিনি। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে রায়েরবাগ ব্রিজ সংলগ্ন এলাকা দিয়ে গ্যারেজের দিকে যাচ্ছিলেন। চারিদিকে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ ব্যাপক গোলাগুলি করছিল। আকস্মিক মধ্যাহ্নে ১২.৩০ টায় কয়েকটি গুলি নুরুর শরীরে এসে বিদ্ধ হয়। ফলে ঘটনাস্থলে লুটিয়ে পড়েন তিনি। পথচারীদের মধ্যে নুরুর বন্ধু তাহের ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। চোখের সামনে বন্ধুকে পড়ে থাকতে দেখে শহীদ নূরুর ছেলেকে ফোন করে বলেন তাড়াতাড়ি আয়, “তোর বাপের শরীরে গুলি লেগেছে”। একে একে পাঁচটি গুলি নুরুকে লক্ষ্য করে করা হয়। অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণ হয়ে দুপুর ১টায় তার মৃত্যু হয়। অতঃপর তার ছেলে ঘটনাস্থল থেকে লাশ বাড়ীতে নিয়ে আসে। ঘাতক পুলিশ পরিবার থেকে চিরদিনের জন্য আলাদা করে দেয় নুরু বেপারীকে। পরবর্তীতে প্রতিবেশীদের সাহায্যে লাশ মাতুয়াইল কবরস্থানে দাফন করা হয়। তার ইচ্ছে ছিল প্রয়াত বাবা-মায়ের পাশে যেন তাকে দাফন করা হয়। কিন্তু পরিবারে আর্থিক অসঙ্গতি থাকায় তা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

মা, আমাদের এখন কি হবে? আমাদের সংসার কিভাবে চলবে!

দৈন্যদশা পরিবার

শহীদ নুরু বেপারী পরিবারের একমাত্র হাল ধরার অবলম্বন ছিলেন। বর্তমানে তাকে হারিয়ে পরিবার দৈন্যদশায় পতিত হয়েছে। স্বামীর মৃত্যুতে মরিয়ম বেগম (৪৪) এখন পরনির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। শহীদ নুর বেপারী উত্তরাধিকার সূত্রে কোনো আবাদি বা বসতী জমি রেখে যাননি। যে কারণে তার পরিবার গ্রামে ফিরে যাওয়ার অবস্থাও বর্তমানে নেই। শাহাদাতের কিছুদিন আগে স্ত্রীকে জানায় মরিয়ম, আর কয়দিন অপেক্ষা কর, আর আমাদের দুঃখ কষ্ট থাকবে না। স্ত্রীকে শেষ কথা বলে যেতে পারেননি নুরু। তার আগেই ঘাতক পুলিশ বাহিনী তাকে হত্যা করেছে। তার স্ত্রী একদিকে যেমন হার্টের রোগী অন্যদিকে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। পরিস্থিতি তাকে মানুষের দুয়ারে নিয়েছে। তাইতো বর্তমানে একপ্রকার বাধ্য হয়ে সামান্য ঔষধ কিনতে অন্যের দ্বারস্থ হতে হয় শহীদ স্ত্রী মরিয়মকে। শহীদের পুত্র ইলিয়াস তার মা’কে জানায় মা, আমাদের এখন কি হবে? আমাদের সংসার কিভাবে চলবে! কে নেবে আমাদের পরিবারের দায়িত্ব? মরিয়ম জানায় আল্লাহ আছে, আল্লাহ আমাদের পাশে থাকবে।

-তিনি ভীষণ সৎ ও ধার্মিক ছিলেন’

প্রতিবেশীর অভিমত

হাজী মো: হজরত আলীর ভাষ্যমতে “আমার বাড়িতে ৯ বছর ধরে ভাড়া আছে নুরু বেপারীর পরিবার। তিনি ভীষণ শান্তশিষ্ট ছিলেন। অন্যান্য ড্রাইভারদের মতো তিনি ছিলেন না। তার পরিবার না খেয়ে থাকলেও, মাসের প্রথম সপ্তাহে আমার ঘর ভাঁড়া দিয়েছেন তিনি। তার ভদ্রতা এবং নিষ্ঠতা দেখে আমি তাকে ভাইয়ের মতো স্নেহ করেছি। তার মৃত্যুতে যেন আমি ভাই হারিয়েছি। আমার নিজের টাকা দিয়ে তার দাফনের ব্যবস্থা করেছি। আমার ভাই পরিচয়ে মাতুয়াইল কবরস্থানে তাকে নিজ হাতে দাফন করেছি। তিনি ভীষণ সৎ ও ধার্মিক ছিলেন। আমার পরিবারকে নিয়ে আমি কখনও বাইরে গেলে নির্দ্বিধায় তার কাছে বাড়ীর চাবি রেখে গিয়েছি। এই ভালো মানুষটির চলে যাওয়া আমার জন্য বড়ই বেদনাদায়ক।”

আবু ছাইম বলেন- “নিরীহ এই মানুষটিকে কেন গুলি করা হল? কেনই বা চিরদিনের জন্য পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করল ঘাতক পুলিশ বাহিনী? এর উত্তর কে দেবে। কিংবা অসহায় পরিবারটির দায়িত্বই বা এখন কে নেবে?”আমার দোষ কি জানেন?

লেখকের সাথে শহীদ নুরু বেপারীর কাল্পনিক আলাপন

আমাকে চিনতে পারছেন? আমিও ছিলাম আপনাদের দলে, আমার নাম ছিল নুরু বেপারী। আমাকে স্বৈরাচারী শাসক খুনি হাসিনার নেতৃত্বে পুলিশ বাহিনী রক্তাক্ত করে হত্যা করেছে। আমার স্ত্রীকে বিধবা করেছে। সন্তানদেরকে চিরদিনের জন্য এতিম করেছে! আমার দোষ কি জানেন? আমি স্বাধীন দেশের নাগরিক ছিলাম। আমিও আওয়াজ তুলেছিলাম,“স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক”। স্ত্রীকে বলেছিলাম, আমি দেশের জন্য ঢাল হয়ে লড়ব। আমিও সেজদায় রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করেছিলাম। পরিবারের মুখে দু-মুঠো খাবার তুলে দিতে রাস্তায় বের হয়েছিলাম আমি। পুলিশ আমাকে থামতে বলেছিল, আমি বলেছিলাম কী দোষ আমার? প্রাণ নিতে চাও? নাও, আমি বুক পেতে দিলাম। গুলি কর। আমি শহীদ হয়ে যাব। সেদিন আমি জামার বোতাম খুলে দিয়েছিলাম সন্ত্রাসীদের সামনে। বুক টানটান করে দাড়িয়ে স্বাধীন দেশের মুক্তি কামনায় স্লোগান দিয়েছিলাম- দফা এক দাবী এক, খুনি হাসিনার পদত্যাগ। আমার দেশ আজ মুক্তি পেয়েছে। আমার দেশের ঠিকানা জানেন-

“আমার দেশের ঠিকানা বন্ধু পাবে

ধীরে ধীরে বয়ে যাওয়া নদীর গানে

আরো পাবে ভালোবাসা ছড়িয়ে

পাপড়ি মেলেছে ঐ শাপলা শালুক যেখানে’’

মহান আল্লাহ আপনাকে জান্নাত নসিব করুন, আপনার ত্যাগ কখনও বাংলাদেশ ভুলবে না। হে বীর যোদ্ধা আপনাকে স্যালুট।

এক নজরে শহীদ নুরু বেপারী

নাম : মো: নুরু বেপারী

পিতার নাম : মৃত মজিদ বেপারী

মাতার নাম : উরফুরী বেগম

পেশা : পিকআপ চালক (বেসরকারি)

স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম: পশ্চিম সরালিয়া, উপজেলা: মোড়েলগঞ্জ, জেলা: চাঁদপুর

মৃত্যুর তারিখ : ২০/০৭/২০২৪

কিভাবে মারা যায় : পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে রায়েরবাগ, যাত্রাবাড়ী ঘটনাস্থলে মৃত্যু বরণ করেন

কবরস্থান : মাতুয়াইল কবরস্থান, ঢাকা

জন্মতারিখ : ০৭/০৫/১৯৭১

বয়স : ৫৩ বছর

সন্তানদের পরিচয় : ১. মো: ইলিয়াস (৩০), পেশা: রিক্সা চালক, সম্পর্ক: ছেলে

২. মোছা: নুসরাত জাহান সোনিয়া (২৪), বিবাহিতা সম্পর্ক: মেয়ে

প্রস্তাবনা : ১. বসবাসযোগ্য স্থায়ী পুনর্বাসন প্রয়োজন

: ২. শহীদের একমাত্র ছেলেকে স্থায়ী কর্মসংস্থান করে দেয়া যেতে পারে

: ৩. শহীদের স্ত্রীকে মাসিক অথবা এককালীন সহযোগিতা করা যেতে পারেকুরআনের আয়াততারা আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত ও সন্তুষ্টি লাভ করবে এবং তাদের জন্য রয়েছে স্থায়ী জান্নাত। (সুরা আল-ইমরান ৩:১৫)হাদীস শরীফরাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “শহীদদের জন্য জান্নাতে বিশেষ মর্যাদা রয়েছে।” (সহীহ বুখারী ২৮০০)

Photographs (8)

Compiled from the public July Sohid memorial register.