মো: আল আমিন
শহীদ ৫ আগস্ট ২০২৪ · সৌদি প্রবাসী
Killed
- Killed
- ৫ আগস্ট ২০২৪ (2024-08-05)
- Occupation
- সৌদি প্রবাসী
- Where
- শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল
- Division
- ঢাকা
জীবনী
প্রবাস থেকে বিজয় মিছিল অতঃপর শাহাদাত
শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার দক্ষিণ মগর গ্রামের এক সাধারণ, পরিশ্রমী পরিবারে জন্ম নেওয়া আল আমীন ছিলেন স্বপ্নবাজ এক তরুণ। ইসমাইল মীরমালত ও জিয়াসমিন বেগম দম্পতির সন্তান আল আমীন শৈশব থেকেই জীবনকে দেখেছেন সংগ্রামের আলো-আঁধারিতে। পরিবারের জীবিকার তাগিদে ছোটবেলা থেকেই বাবা-মায়ের সঙ্গে সৌদি আরবে প্রবাসজীবন শুরু হয় তার। বিদেশের মাটিতে বড় হলেও দেশের প্রতি টান, মানুষের প্রতি মমত্ববোধ আর ন্যায়ের আকাঙ্ক্ষা কখনো ম্লান হয়নি।
দীর্ঘ বছর সৌদি আরবে অবস্থানের পর, পরিবারের সদস্যরা একে একে দেশে ফিরে আসেন। আল আমীন এক বছর পরিবার থেকে আলাদা থেকে প্রবাসে ছিলেন। অবশেষে চার মাস আগে, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনি দেশে ফেরেন। বয়স তখন ২৯। দেশে ফিরে সাভারের বাইপাইল এলাকায় বাবার সঙ্গে একটি ছোট মুদিদোকান খুলে নতুনভাবে জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি। বাবা–ছেলের সেই দোকান শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়, ছিল বহুদিন পর একসঙ্গে থাকার আনন্দ আর ভবিষ্যতের আশা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। খুনি শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে বিজয়ের আনন্দ, মিছিল আর স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে রাজপথ। সেই বিজয় মিছিলে যোগ দিতে বিকেল চারটার দিকে বাসা থেকে বের হন আল আমীন। তিনি ছিলেন রাজনীতি বোঝা বা ক্ষমতার লড়াইয়ের মানুষ নন; ছিলেন একজন সাধারণ নাগরিক, যিনি অন্যায়ের পতন আর ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় আনন্দ ভাগাভাগি করতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু সেই আনন্দের মিছিলই তার জীবনের শেষ মিছিল হয়ে দাঁড়ায়। মিছিলে যোগ দেওয়ার পর হঠাৎ গুলিবিদ্ধ হন আল আমীন। স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরদিন তিনি মৃত্যুবরণ করেন। পরিবারের সদস্যদের খুঁজে না পাওয়ায় তাকে অজ্ঞাত লাশ হিসেবে হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়। প্রায় ১২ দিন ধরে বাবার সন্তান, মায়ের বুকের ধন হাসপাতালের মর্গে পড়ে থাকে অচেনা, নিঃসঙ্গ, পরিচয়হীন।
এই হৃদয়বিদারক অধ্যায়ের অবসান ঘটে একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের মাধ্যমে। খবরটি চোখে পড়ে আল আমীনের ছোট বোন আফলান সিনথিয়ার। তিনি দ্রুত শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে গিয়ে ভাইয়ের লাশ শনাক্ত করেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর অসহ্য অনিশ্চয়তার পর পরিবারের হাতে ফিরে আসে আল আমীনের নিথর দেহ। সেই রাতেই গ্রামের বাড়িতে জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয়।
সন্তান হারিয়ে আজ পাগলপ্রায় বাবা-মা। বাবা ইসমাইল মীরমালতের কণ্ঠে অসীম বেদনা “ছেলের লাশটা ১২ দিন বেওয়ারিশ হয়ে মর্গে পড়ে ছিল। বাবা হিসেবে এই যন্ত্রণা কাউকে বোঝাতে পারব না।” মা জিয়াসমিন বেগমের চোখে এখন শুধু শূন্যতা। পরিবারের আশা ছিল, ডিসেম্বরে আল আমীনের বিয়ে হবে, সংসার গড়বে সে। সেই স্বপ্ন কবর হয়ে গেছে একসঙ্গে তার সঙ্গে।
আল আমীন ছিলেন কোনো দলের ক্যাডার নন, ছিলেন না কোনো ক্ষমতার খেলোয়াড়। তিনি ছিলেন সাধারণ মানুষের একজন যিনি জীবনের শেষ মুহূর্তে ন্যায়ের বিজয় দেখতে রাজপথে নেমেছিলেন। তার মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোক নয়, এটি একটি খুনি হাসিনার ব্যর্থতারও প্রতিচ্ছবি।
শহীদ আল আমীনের স্মৃতি আজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই দেশে অনেক সময় সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি মূল্য দেয়। তার রক্তের দায় ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে, আর তার নাম থাকবে সেইসব নীরব শহীদদের কাতারে, যারা কিছু না চেয়েও সবকিছু দিয়ে গেছেন।
শহীদের প্রোফাইল নাম : মো: আল আমিন
জন্ম : ০৮/১০/১৯৯৫
পেশা : সৌদি প্রবাসী
পিতা : ইসমাঈল মীরমালত
মাতা : জেসমিন বেগম
স্থায়ী ঠিকানা : দক্ষিণ মগর, নড়িয়া, শরীয়তপুর
ঘটনার স্থান : বাইপাইল, গাজীপুর
আক্রমণকারী : ঘাতক পুলিশ
আহত হওয়ার সময়কাল : তারিখ: ৫ আগষ্ট ২০২৪
শাহাদাত : ৫ আগষ্ট ২০২৪, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল হাসপাতাল
কবরস্থান : নিজ গ্রাম (দক্ষিণ মগর, নড়িয়া, শরীয়তপুর)
ভাই-বোন : ২ জন
১. আফলান সিনথিয়া, সম্পর্ক: বোন
২. মোহাম্মাদ সাদ, সম্পর্ক: ছোট ভাইকুরআনের আয়াততারা আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত ও সন্তুষ্টি লাভ করবে এবং তাদের জন্য রয়েছে স্থায়ী জান্নাত। (সুরা আল-ইমরান ৩:১৫)হাদীস শরীফহজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে শহীদ হতে চায়, আল্লাহ তাকে শহীদের সাওয়াব দেন।” (সহীহ মুসলিম ১৮৮৯)
Photographs (6)
Compiled from the public July Sohid memorial register.