Skip to the archive
July Diary
Search the archive
Portrait of শহীদ আরাফাত হুসাইন

শহীদ আরাফাত হুসাইন

শহীদ ২২ ডিসেম্বর ২০২৪ · ছাত্র

Killed

Killed
২২ ডিসেম্বর ২০২৪ (2024-12-22)
Occupation
ছাত্র
Studied at
উত্তরা জামিয়া রওজাতুল উলুম মাদরাসা
Division
ঢাকা সিটি

জীবনী

ঢাকার উত্তরের আজমপুরের পাকুরিয়া এলাকার একটি সরু গলির ভেতরে টিনের ছাউনি দেওয়া ছোট ঘরে জন্ম নেয় এক মিষ্টি, হাসিখুশি শিশু আরাফাত হুসাইন। পিতা শহীদুল ইসলাম ছিলেন রিকশাচালক, প্রতিদিন ভোরে রিকশা নিয়ে বের হতেন রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে, শুধু এই আশায় যে ছোট্ট ছেলেটাকে লেখাপড়া শেখাবেন। মা সালেহা আক্তার সংসারের দুঃখ-দুর্দশার মধ্যেও সন্তানদের মুখে হাসি দেখলে শান্তি পেতেন। পরিবারে বড় ভাই হাসান আলী ছিল একমাত্র অবলম্বন। ভাইয়ের কাঁধে ছিল সংসারের ভার, তবুও সে আরাফাতকে সবসময় সাহস দিত, “তুই পড়লে অনেক বড় মানুষ হতে পারবি।” দারিদ্র্য ছিল স্থায়ী অতিথি, তবুও তাদের ঘরে ভালোবাসার অভাব ছিল না। আরাফাত পড়ত উত্তরা জামিয়া রওজাতুল উলুম মাদরাসার পঞ্চম শ্রেণিতে। শান্ত ও শৃঙ্খলাপরায়ণ ছাত্র হওয়ায় শিক্ষকরা প্রায়ই বলতেন “এই ছেলেটার চোখে অদ্ভুত এক দীপ্তি আছে। মনে হয় যেন সে পৃথিবীতে এসেছে কোনো দায়িত্ব নিয়ে।” ছোটবেলা থেকেই আরাফাত বাচ্চাদের সাহায্য করতে আনন্দ পেত। পরিবারের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও সে ছিল তৃপ্ত ও পরিশুদ্ধ এক শিশু প্রাণ।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের আহ্বান

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে যখন সারাদেশে জ্বলে উঠেছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, তখন শহর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এক তরুণ বিদ্রোহের ডাক। স্কুল, কলেজ, মাদরাসা সবখানেই সমতার স্লোগান। “অন্যায় মানি না, বৈষম্য চাই না।” এই আওয়াজেই যেন নতুন প্রজন্ম নিজের ভবিষ্যৎ দেখতে পায়। এই আন্দোলনের সবচেয়ে উত্তাল সময় ৫ আগস্ট ২০২৪। ছাত্র জনতার রোষানলে পড়ে খুনি হাসিনা ও তার স্বৈরাচারী সরকার দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। এরপর সারাদেশে আনন্দ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। মিছিল সংঘটিত হয় রাজধানীর উত্তরা সংলগ্ন আজমপুর এলাকায়ও। যেখানে যোগ দেয় শত শত তরুণ শিক্ষার্থী। ছোট্ট আরাফাতও তার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে উৎসুক চোখে দেখছিল মিছিলের দৃশ্য। কিছুক্ষণ পর সেও মিছিলে যোগ দেয়। কিন্তু সেই আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হয় বিভীষিকায়। হঠাৎই আজমপুর থানার সামনে শুরু হয় ঘাতক পুলিশের গুলিবর্ষণ। চারদিকে আতঙ্ক, ধোঁয়া আর চিৎকার। আর সেই বিশৃঙ্খলার মাঝেই এক গুলি এসে লাগে ছোট্ট আরাফাতের শরীরে। গুলিটি তার পাঁজরের নিচ দিয়ে ঢুকে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে যায়। মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে। চারপাশে রক্ত, ধুলো আর ক্রন্দন। ভাই হাসান ছুটে এসে ছোট ভাইটিকে কোলে তুলে নেন। আরাফাত তখন আধোচেতনা অবস্থায় শুধু বলছিল, “ভাইয়া, আমাকে বাঁচাও।”

১৩৯ দিনের চিকিৎসা লড়াই

গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে প্রথমে নিকটবর্তী উত্তরা হাউজবিল্ডিং সংলগ্ন আধুনিক হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু অবস্থা গুরুতর হওয়ায় দ্রুত পাঠানো হয় কুর্মিটোলা হাসপাতালে, সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ)। চিকিৎসক ডা. হুমায়ুন কবির হিমু বলেন, “গুলিটি তার ফুসফুস ও মেরুদণ্ড একসাথে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এমন ইনজুরি শিশুর শরীরে টিকে থাকা অলৌকিক।” দিনের পর দিন কেটে যায় হাসপাতালের সাদা দেয়ালের ভেতরে। ছোট্ট শরীরে অসংখ্য অস্ত্রোপচার, পাইপ, ওষুধ, যন্ত্রের শব্দ। তিনবার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়, কিন্তু প্রতিবারই ফিরে আসে তার প্রাণ। হয়তো মায়ের কান্না আর ভাইয়ের প্রার্থনাই তাকে এতদিন বাঁচিয়ে রেখেছিল। প্রথম দিকে কিছুটা উন্নতি হয়েছিল। চিকিৎসকেরা আশার আলো দেখেছিলেন। কিন্তু নভেম্বরের শেষ দিক থেকে তার অবস্থা ক্রমেই অবনতি হতে থাকে। পরিবার, চিকিৎসক, ও আন্দোলনকারীদের সহযোগিতায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তাকে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হবে। ২৪ ডিসেম্বর ২০২৪ সকালে এয়ার অ্যাম্বুল্যান্সে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছিল।

কিন্তু মহান আল্লাহর ইচ্ছা ছিল ভিন্ন। তার আগের রাতেই, ২২ ডিসেম্বর ২০২৪, রবিবার রাত সাড়ে ১০.০০টার দিকে, শিশু আরাফাতের হৃদযন্ত্র থেমে যায় চিরতরে। হাসপাতালের বাতাসে তখন শোনা যাচ্ছিল এক মায়ের বুকভাঙা চিৎকার,

“আমার ছেলেটা তো শুধু মিছিল দেখতে গিয়েছিল, ওকেও হাসিনা খুন করলো। আমি এই খুনের বিচার চাই”

নিকটাত্মীয়ের অভিমত

শিশু শহীদ আরাফাতের বড় ভাই মো: হাসান আলী বলেন, ৫ আগস্ট ২০২৪, বিকেলে আনন্দ মিছিলে যোগ দিয়ে আরাফাত। আজমপুর থানার সামনে গেলে সেখানে সে গুলিবিদ্ধ হয়। একটি গুলি তার পাঁজরের নিচ দিয়ে ঢুকে পিঠ দিয়ে বের হয়ে আসে। সেই গুলিতে তার ফুসফুস ছিদ্র হয়ে যায়। একই সঙ্গে মেরুদণ্ড গুঁড়া হওয়ার পাশাপাশি পাকস্থলী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে আধুনিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে থেকে তাকে কুর্মিটোলা হাসপাতালে পাঠানো হলে পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিএমএইচে পাঠানো হয়। এর পর থেকে সে সেখানেই চিকিৎসাধীন ছিল। ১৩৯ দিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে শাহাদাত বরণ করেছে৷ আমার ভাই হত্যার বিচার চাই ।

বিদায়, ছোট্ট শহীদ

১৩৯ দিনের সংগ্রাম শেষে মৃত্যু। কিন্তু সেই মৃত্যু শুধু এক শিশুর নয় এক জাতির বিবেকের মৃত্যু। পরের দিন ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪, সোমবার বেলা ৩.০০টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত হয় আরাফাতের জানাজা। হাজারো মানুষ চোখের জলে তাকে শেষ বিদায় জানায়। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, আন্দোলনের কর্মী, সাধারণ মানুষ সবার কণ্ঠে একটাই স্লোগান- “শহীদ আরাফাতের রক্ত বৃথা যেতে দেব না!”

জানাজার পর উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে দাফন করা হয় তাকে। একজন রিকশাচালকের ছেলে, যে হয়তো বড় হয়ে আলেম হতে পারত, আজ ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়ে গেল শহীদের নাম হিসেবে।

প্রতিক্রিয়া ও জাতির শোক

আরাফাতের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের অফিসিয়াল পেজে লেখা হয়-

“শহীদী মিছিলে যোগ দিয়েছে আমাদের আরেক ভাই। বারো বছরের শিশু আজ অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক প্রতীক।”

স্বাস্থ্য উপকমিটির সদস্য সচিব তারেক রেজা বলেন, “ওর শরীর হয়তো ছোট ছিল, কিন্তু সাহসটা ছিল বিশাল। আমরা সবাই হারালাম এক সম্ভাবনা।”

দেশজুড়ে মানুষ সামাজিক মাধ্যমে শোক প্রকাশ করে। সমকাল, ইত্তেফাক, ইন্ডিপেন্ডেন্ট, বিএসএস পত্রিকা সহ বেশ কিছু সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়“১৩৯ দিনের লড়াই শেষে হার মানল ছোট্ট আরাফাত।”

রিকশাচালকের ঘরের সন্তান থেকে জাতির শহীদ

রিকশাচালক পিতার ঘামে ভেজা টাকা দিয়ে কেনা বইয়ের পাতা আজ ইতিহাসের দলিল হয়ে গেছে। দারিদ্র্যের সীমা অতিক্রম করে, অল্প বয়সেই আরাফাত হয়ে উঠেছে এক যুগের প্রতীক। তার জীবনের কষ্ট, সংগ্রাম আর শহীদত্ব মনে করিয়ে দেয়- "দেশের স্বাধীনতা কেবল অতীতের যুদ্ধের গল্প নয়, বরং প্রতিদিনের লড়াইয়ের নাম।" আরাফাতের মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই কখনো বয়স দেখে না। একজন রিকশাচালকের ঘরে জন্ম নেওয়া শিশুও হতে পারে জাতির অনুপ্রেরণা।

শিশু আরাফাতকে নিয়ে নিউজ মিডিয়ায় প্রকাশিত প্রামাণ্য লিংক সমূহ

১.https://www.ittefaq.com.bd/711667/

২.https://samakal.com/bangladesh/article/271732/

৩.https://youtu.be/LvdwfmCtXdU?si=GjFwOrMQ4MyQP2GP

৪.https://youtu.be/35H2vXPEVpc?si=dhJ8RG88Gz8R7PiN

সারসংক্ষেপ

শহীদ আরাফাত হুসাইন (২০১২–২০২৪)

পিতা: শহীদুল ইসলাম (রিকশাচালক)

মাতা: সালেহা আক্তার

বড় ভাই: হাসান আলী

পেশা: ছাত্র, প্রতিষ্ঠান: উত্তরা জামিয়া রওজাতুল উলুম মাদরাসা, শ্রেণি: পঞ্চম

ঘটনার তারিখ : ৫ আগস্ট ২০২৪

স্থান: আজমপুর থানা সংলগ্ন

আক্রমণকারী: উত্তরা, আজমপুর থানার ঘাতক পুলিশ

চিকিৎসা:

১. উত্তরা আধুনিক হাসপাতাল

২. কুর্মিটোলা হাসপাতাল

৩. সিএমএইচ

শাহাদাতের তারিখ: ২২ ডিসেম্বর ২০২৪

সময়: রাত ১০:৩০টা

স্থান: সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল

চিকিৎসার মেয়াদ: ১৩৯ দিন

দাফন: উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টর কবরস্থান

পুনর্বাসন সংক্রান্ত প্রস্তাবনা

১. আরাফাতের পিতার জন্য একটি ইলেকট্রিক রিকশা বা ছোট দোকানের পুঁজি সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন

২. শহীদ পরিবারের জন্য মাসিক বা এককালীন সহযোগিতা প্রদান

৩. আরাফাতের ভাইয়ের কর্মসংস্থান করা যেতে পারেকুরআনের আয়াততাদের প্রতিদান তাদের রবের কাছে রয়েছে, জান্নাত, যার নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত, তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। (সুরা আল-ইমরান ৩:১৪৭)হাদীস শরীফরাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “শহীদদের জন্য জান্নাতে ৭০ জন আত্মীয়কে সুপারিশ করার অধিকার থাকবে।” (সুনান আবু দাউদ ২৫২০)

Photographs (9)

Compiled from the public July Sohid memorial register.